প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রত্যেকের যা যা জানা দরকার

প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রত্যেকের যা যা জানা দরকার

প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রত্যেকের যা যা জানা দরকার

প্রাথমিক চিকিৎসাঃ

প্রাথমিক চিকিৎসা মানে হলো প্রথম চিকিৎসা। এটা কে ইংরেজীতে First aid বলে।

একজন আহত ব্যক্তিকে সর্ব প্রথম যে সহযোগিতা বা সেবা প্রদান করা হয় তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা বলে। যেকোনো আকস্মিক দুর্ঘটনায় প্রাথমিকভাবে হাতের কাছের জিনিস দ্বারা রোগীকে চিকিৎসা করাকে প্রাথমিক চিকিৎসা বলে। রোগীকে প্রথম অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয় যাতে ডাক্তার আসার পূর্বে রোগীর অবস্থার অবনতি না ঘটে বা জটিলতা সৃষ্টি না হয়।

প্রাথমিক চিকিৎসার লক্ষ্য/ উদ্দেশ্যঃ

ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীর জীবনকে রক্ষা এবং তাৎক্ষণিক ত্বরিত ব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কমিয়ে আনা। তাছাড়া সামান্য বা গুরুতর অসুস্থতা বা আঘাতজনিত যেকোনো রোগীর জীবন রক্ষা করা, অবস্থার অবনতি থেকে বাঁচতে বা পুনরুদ্ধারের জন্য যত্নসহকারে দেওয়া প্রথম বা তাৎক্ষণিক সহায়তা করাই হল প্রাথমিক চিকিৎসার উদ্দেশ্য।

প্রাথমিক চিকিৎসা করার জন্য ফার্স্ট এইড বক্সের কিছু উপকরণের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। আমাদের দেশে ফার্স্ট এইড বক্স পরিচিত হলেও প্রশিক্ষণ বা সেই জরুরি মুহূর্তে করণীয় বিষয়গুলো খুব একটা পরিচিত নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তা কখনো কখনো সুফল বয়ে আনে বা কারও জীবন রক্ষা করতে সহায়তা করে। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে কারও ভালো জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ থাকলে সে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনো অসুস্থতা বা আঘাতের পর করণীয় ঠিক করতে পারে; যা জীবন রক্ষা করতে পারে। বাড়িতে একটি ফার্স্ট এইড বক্স থাকলে তা কাজেই লাগবে।

প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শনিবার ‘বিশ্ব ফার্স্ট এইড ডে’ বা প্রাথমিক চিকিৎসা দিবস পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এদিন বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কীভাবে প্রতিদিন এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে, সে সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দিনটি উদ্‌যাপিত হয়।

প্রাথমিক চিকিৎসকের করণীয় কাজঃ

  • রোগীর কি হয়েছে তা প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে
  • রোগীর জখম বা অবস্থার সাথে শান্তভাবে এবং দক্ষভাবে মোকাবেলা করা
  • আহতের যত্নের পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবস্থা করা অর্থাৎ আহত যাতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া, বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া অথবা আহতকে হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করা।
  • একজন ভাল প্রাথমিক চিকিৎসককে সম্পদের সম্ভাবনা সন্ধানে দক্ষ হত হবে এবং হাতের কাছে যা কিছু পাওয়া যাবে তা কাজে লাগাতে সমর্থ হতে হবে।

প্রাথমিক চিকিৎসকের বর্জনীয় বিষয়ঃ

  • বিষ পানের রোগীকে ঘুমাতে দেয়া।
  • অজ্ঞান অবস্থায় রোগীকে কিছু খেতে দেওয়া।
  • রোগীকে বেশি নাড়াচাড়া করা।
  • রোগীর চারপাশে বেশি ভিড় জমতে দেওয়া।

প্রাথমিক চিকিৎসকের গুনাবলীঃ

  • দ্বায়িত্বশীল
  • বন্ধুভাবাপন্ন/বন্ধুসুলভ
  • গর্ব (স্বাস্থ্য, পোষাক, দৃষ্টিগোচরতা)
  • সৎ
  • আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা
  • পেশাগত আচার আচরণ
  • সুস্বাস্থ্যের অধিকারী
  • কার্যপ্রণালী প্রদর্শনে সমর্থ

রোগী পর্যবেক্ষণঃ

যে কোন দুর্ঘটনাস্থলে রোগীর নিকট নিজেকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে ও রোগীকে ঠিক মতো পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যেটা প্রাথমিক চিকিৎসক এবং রোগী উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অসুস্থ তথা আহত রোগীর অবস্থা অনড় তথা উন্নয়নকল্পে একজন প্রাথমিক চিকিৎসকের নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরন করা উচিৎ।

ফার্স্ট এইড বক্স কী?

ফার্স্ট এইড বক্স হলো একটি বহনযোগ্য বক্স। এতে অনেক কিছুই থাকতে পারে। যেগুলো নিয়ে প্রাথমিকভাবে ছোটখাটো দুর্ঘটনার মোকাবিলা করা যাবে। যাতে একজন মানুষ কোনোভাবে আহত বা হঠাৎ করে অসুস্থ হলে তাকে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায়। কিছু সরঞ্জাম ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, এখন কী করতে হবে রোগীর জন্য। আবার কিছু থাকে, যা দিয়ে প্রাথমিকভাবে অবস্থা সামাল দিয়ে কিছু সময় পাওয়া যায়, যেটা ব্যবহার করে দুর্ঘটনায় পড়া মানুষকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়।

ফার্স্ট এইড বক্সে কী থাকে?

পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে ফার্স্ট এইড বক্স একটু ভিন্ন হতে পারে, তবে অতিপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব কটিতে প্রায় একই থাকে।

গজ ব্যান্ডেজ

খুবই দরকারি একটি উপকরণ। রোল আকারে পাওয়া যায়। যেকোনো মেডিসিনের দোকানেই পাওয়া যায়।

তুলা বা কটন

তুলা ছোট ও বড় প্যাকেট—দুভাবেই পাওয়া যায়। নিরাপত্তার জন্য প্যাকেট তুলাই ভালো।

ক্রেপ ব্যান্ডেজ

হাড় ফেটে গেলে বা কোথাও মচকে গেলে ক্রেপ ব্যান্ডেজ ব্যবহারে ব্যথা কমে, ফোলাও ক্রমে কমে আসে।

সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজ

সব দিয়ে সহজেই ক্ষতের ওপরে ব্যান্ডেজ আটকে রাখা যায়। তবে খুব ভালো ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।

কাঁচি

ক্ষতের পাশে প্রয়োজনে পরনের কাপড় কাটা, গজ, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি কাটার জন্য কাঁচি দরকার।

চিমটা (ফরসেপ)

অনেক সময় ক্ষতে ক্ষুদ্র আঠালো ময়লা থাকে, যেগুলোকে তুলা দিয়ে মুছে ফেলা যায় না, আবার পানি দিয়েও পরিষ্কার হয় না। এ ক্ষেত্রে চিমটা কাজে আসতে পারে।

সেফটি পিন

ফার্স্ট এইড বক্সে এটিও ভালো উপকরণ, যাকে নানা কাজে ব্যবহার করা যায়।

সার্জিক্যাল গ্লাভস

পানি বা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেওয়ার কোনো দরকার নেই; যদি থাকে ডিসপোজেবল গ্লাভস। ক্ষত ময়লা হাত দিয়ে পরিষ্কার করার চেয়ে এটা পরে করা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত।

টর্চ

টর্চের ফার্স্ট এইড উপকরণ হিসেবে ব্যবহার বলে শেষ করা যাবে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিসেপটিক

স্যাভলন বা ডেটল, হেক্সিসল—এমন নানা রকম অ্যান্টিসেপটিক বক্সে রাখতে পারেন। কিছু অ্যান্টিসেপটিক ক্রিমও পাওয়া যায়, যা অনেক উপকারী।

থার্মোমিটার

জ্বর এলে বা শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করার জন্য এর বিকল্প নেই। খুব সহজেই এটি দিয়ে জ্বর মাপা যায়। ফার্স্ট এইড বক্সের অন্যতম উপাদান এটি।

ওষুধ

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, পেট খারাপের ওষুধ, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথার ওষুধ, খাওয়ার স্যালাইন, বমি, জ্বরের ওষুধ ইত্যাদি বক্সে থাকলে বিশেষ মুহূর্তে খুবই কাজে লাগে। বার্ন ক্রিম, ব্যথানাশক মলম, অ্যালার্জির ওষুধও রাখা যায়।

পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট

এটিও বক্সে রাখা যেতে পারে।

পালস অক্সিমিটার

বর্তমানে এটি একটি জরুরি উপকরণ হয়ে পড়েছে। এই করোনা মহামারিতে কারও জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট হলে এটি দিয়ে সহজেই রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা ও হৃৎস্পন্দনের মাত্রা জানা যায়।

রক্তচাপ মাপার যন্ত্র

বিশেষ মুহূর্তে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটু শিখে নিলে এটি দিয়ে সহজেই রক্তচাপ মাপা যায়। এখন ডিজিটাল যন্ত্র পাওয়া যায়, যা দিয়ে সহজেই রক্তচাপ মাপা যায়।

গ্লুকোমিটার

কারও রক্তের শর্করা কমে বা বেড়ে গিয়ে অচেতন হয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এটি খুবই কার্যকর একটি উপকরণ হতে পারে।

প্রাথমিক চিকিৎসার যন্ত্রপাতি

প্রাথমিক চিকিৎসা এর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ বা বাক্স পাওয়া যায়। সাধারণত এগুলি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাক্স হয়ে থাকে। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাগ বা বাক্সের ওপর সাধারণত সবুজ পটভূমিতে একটি সাদা ক্রস দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে।

ফার্স্ট এইড কিটের সম্ভাব্য জিনিসপত্রগুলো হলো তথ্য লিফলেট, মাঝারি ও বড় স্টেরাইল ড্রেসিংস, ব্যান্ডেজগুলো- গজ রোলার ব্যান্ডেজ/ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ/আঠালো ব্যান্ডেজ/ত্রিভুজাকার ব্যান্ডেজ, টর্নিকোয়েট, সুরক্ষা পিন, জীবাণুমুক্ত ভেজা ওয়াইপ, মাইক্রোপারাস টেপ, নাইট্রাইল গ্লাভস, ফেসশিল্ড, ফয়েল কম্বল, পোড়া পোশাক, পোশাকের কাঁচি, কনফার্মিং ব্যান্ডেজ, ফিঙ্গার ড্রেসিং, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, কাঁচি, ট্যুইজার, সরঞ্জামগুলো স্যানিটাইজিংয়ের জন্য অ্যালকোহল প্যাড, কয়েকটি জরুরি ওষুধ ইত্যাদি।

প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ

সুরক্ষা বাড়ায়ঃ

প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণের ভিত্তি হলো প্রতিরোধ। দুঃখিত হওয়ার চেয়ে নিরাপদ থাকা সব সময় ভালো। প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞানটি মানুষের মধ্যে সুরক্ষা ও সুস্বাস্থ্যের বোধকে উৎসাহ দেয়, তারা আশপাশে যে পরিবেশে বাস করে, তাদের আরও সচেতন ও নিরাপদ হতে উৎসাহ দেয়।

ব্যথা উপশম করতে সহায়তা করেঃ

কিছু আঘাতের জন্য আইস প্যাক লাগানো বা দ্রুত ঘষার মতো খুব সাধারণ সমাধান প্রয়োজন। কিছু কিছু সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে, প্রাথমিক চিকিৎসা কোর্সে প্রশিক্ষিত একজনের সহায়তাই যথেষ্ঠ। প্রাথমিক চিকিৎসার সহজ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে ব্যথা কমাতে সহায়তা করা যায় এবং কমপক্ষে অস্থায়ীভাবে ব্যথা উপশম করা যেতে পারে।

জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেঃ

প্রাথমিক চিকিৎসা প্রয়োগে আশপাশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে এবং দুর্ঘটনা কবলিত মানুষের জীবন বাঁচানো যেতে পারে। দুর্ঘটনা কবলিত অবস্থায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি ট্রমাজনিত পরিস্থিতিতে বেশি উপকার করতে পারেন।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে বাধা দেয়ঃ

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি জানেন কীভাবে পরিস্থিতিকে খারাপ থেকে আরও খারাপ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়। পেশাগত সহায়তা না আসা পর্যন্ত তারা অস্থায়ী চিকিৎসা সরবরাহ করবে, যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অবস্থার অবনতি থেকে রক্ষা করবে।

জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসহায়তার প্রয়োজনে অনেক লোক মারা যাওয়ার কারণ প্রাথমিক চিকিৎসার অভাব। প্রাথমিক চিকিৎসা এর জ্ঞান আপনার নিজের জন্য যেমন তেমনি আপনার আশপাশের মানুষের জন্যও মূল্যবান। সহায়তা না আসা পর্যন্ত দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে পড়লে আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে আপনাকে সক্ষম করে তুলবে প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষার সূচনা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এতে শিশুরা প্রাথমিক চিকিৎসার প্রাথমিক দিকগুলো শিখতে পারবে জীবনের শুরুতেই। প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা করতে এবং মানুষকে সহায়তা করার প্রবণতা বিকাশে অনুপ্রাণিত করা উচিত।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *